ভুল করতে ভয় পাওয়াই ইংরেজি না শেখার সবচেয়ে বড় কারণ
ভুলের ভয় ভাঙার এক নতুন গল্প
কল্পনা করুন তো, এক বছরের একটি শিশু হাঁটতে শিখছে। সে কি প্রথমবার পা ফেলেই সোজা দৌড়াতে শুরু করে? একদমই না। সে বারবার আছাড় খায়, থপাস করে পড়ে যায়, আবার উঠে দাঁড়ায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পড়ে যাওয়ার পর সে কিন্তু লজ্জা পেয়ে বসে থাকে না। সে ভাবে না যে পাশের ঘরে থাকা বড়রা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে। সে আবার চেষ্টা করে এবং এক সময় সফল হয়।
কিন্তু সমস্যাটা হয় যখন আমরা বড় হই। আমাদের ভেতরে এক অদ্ভুত ‘ভয়’ দানা বাঁধে। বিশেষ করে যখন প্রশ্ন আসে ইংরেজি অপভাষায় কথা বলার। আমরা মনে মনে হাজারটা বাক্য সাজাই, কিন্তু মুখ খোলার সময় মনে হয়—‘যদি গ্রামারে ভুল হয়?’, ‘যদি উচ্চারণে গড়বড় হয়ে যায়?’, ‘লোকে কী ভাববে?’। ডক্টর স্টিফেন ক্র্যাশেন, একজন বিখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক, একে বলেছেন ‘Affective Filter’। অর্থাৎ, লজ্জা, ভয় বা চাপের কারণে আমাদের মস্তিষ্ক নতুন কিছু শেখার দরজা বন্ধ করে দেয়। আজ আমরা কথা বলব কীভাবে এই ভয়টাই আপনার ইংরেজি শেখার পথের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং কীভাবে আপনি এই দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসবেন।
কেন আমরা নির্ভুল হওয়ার নেশায় বুদ হয়ে থাকি?
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ছোটবেলা থেকেই আমাদের শিখিয়েছে যে ভুল করা মানেই নম্বর কাটা যাওয়া। পরীক্ষার খাতায় একটা বানান ভুল মানেই লাল কালির দাগ। এই মানসিকতা আমাদের অবচেতন মনে গেঁথে গেছে। ফলে আমরা ইংরেজিকে একটি ‘ভাষা’ হিসেবে না দেখে একটি ‘পরীক্ষা’ হিসেবে দেখতে শুরু করি। আমাদের মাথায় সবসময় গ্রামারের সূত্রগুলো ঘুরপাক খায়—টেন্স ঠিক আছে তো? থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বারের পরে ‘s’ দিলাম তো?
বাস্তবতা হলো: ভাষা যোগাযোগের মাধ্যম, পাণ্ডিত্যের নয়। আপনি যখন বাংলায় কথা বলেন, আপনি কি প্রতিবার ভাবেন যে আপনি ‘বিধেয়’ বা ‘উদ্দেশ্য’ ঠিকঠাক ব্যবহার করছেন কি না? অবশ্যই না! তাহলে ইংরেজিতে কেন এত ভয়? আপনি যদি অন্যের সাথে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারেন, তবেই আপনি ভাষার প্রথম ধাপে সফল।
ভুল করাই হলো শেখার প্রথম ধাপ
আপনি যদি ভুল না করেন, তার মানে আপনি নতুন কিছু চেষ্টা করছেন না। যারা খুব ভালো ইংরেজি বলেন, তারা একদিনে সেখানে পৌঁছাননি। তারা শত শত ভুল বাক্য বলেছেন, ভুল উচ্চারণ করেছেন এবং সেই ভুলগুলো থেকেই শিখেছেন। ভুল হলো একটি ফিডব্যাক লুপ। আপনি যখন ভুল করেন, আপনার মস্তিষ্ক তখন বুঝতে পারে কোথায় সংশোধন দরকার। কিন্তু ভয়ের কারণে যদি আপনি শুরুই না করেন, তবে আপনার মস্তিষ্ক সেই সুযোগটাই পায় না।
পারফেকশনিজম: আপনার অগ্রগতির শত্রু
অনেকেই ভাবেন, ‘আমি আগে সব গ্রামার শেষ করব, তারপর কথা বলব।’ এটি একটি মস্ত বড় ভুল ধারণা। সাইকেল চালানো শিখতে হলে যেমন প্যাডেল মারতে মারতে হাত-পা ছালতে হয়, ইংরেজি শিখতেও তেমনি ভুল ইংরেজিতেই কথা বলা শুরু করতে হয়। পারফেকশনিজম আপনাকে অলস এবং ভয়ে কুঁকড়ে রাখে। মনে রাখবেন, ‘Done is better than perfect’। অর্থাৎ, ভুলভাবে বলাও একেবারেই না বলার চেয়ে অনেক ভালো।
- ভুল ১: গ্রামারে অতিরিক্ত মনোযোগ।
- ভুল ২: শব্দভাণ্ডার কম বলে অজুহাত দেওয়া।
- ভুল ৩: লোকে হাসবে এই ভেবে নিজেকে গুটিয়ে রাখা।
কীভাবে ভয়ের এই বৃত্ত থেকে বের হবেন?
ভয় কাটানো একদিনের কাজ নয়, এটি একটি প্রক্রিয়া। নিচের টিপসগুলো আপনাকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে:
১. নিজের সাথে কথা বলুন (Mirror Talk)
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সাথে কথা বলা শুরু করুন। সেখানে আপনাকে বিচার করার কেউ নেই। আপনি আজ সারাদিন কী কী করলেন বা আগামীকাল আপনার পরিকল্পনা কী—তা ইংরেজিতে বলার চেষ্টা করুন। ভুল হলে নিজেই নিজেকে সংশোধন করুন, কিন্তু দমে যাবেন না।
২. ছোট ছোট বাক্য দিয়ে শুরু করুন
হুট করেই বিশাল বক্তৃতা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ‘I am going’, ‘It was a nice experience’, ‘How are you?’—এমন ছোট ছোট বাক্য দিয়ে মানুষের সাথে কথা বলা শুরু করুন। আত্মবিশ্বাস বাড়লে বড় বাক্যে হাত দিন।
৩. মানুষ হাসলে হাসুক
সবচেয়ে বড় ভয় হলো ‘লোকে কী ভাববে’। বিশ্বাস করুন, লোকে আপনার ভুল নিয়ে বড়জোর দুই মিনিট হাসবে, কিন্তু আপনি যদি ইংরেজি শিখে যান, সেই মানুষগুলোই আপনার প্রশংসা করবে। সফল ব্যক্তিরা সবসময় সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করেন। যারা আপনার ভুল ধরিয়ে দিচ্ছে, তাদের শিক্ষক হিসেবে ভাবুন, শত্রু হিসেবে নয়।
৪. পরিবেশ তৈরি করুন
ইংরেজি শেখার জন্য বিলেত যাওয়ার দরকার নেই। আপনার চারপাশেই ইংরেজি মিশিয়ে দিন। ফোনে ইংরেজি সিনেমা দেখুন (সাবটাইটেলসহ), ইংরেজি গান শুনুন এবং ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা ইংরেজিতে চর্চা করে তাদের সাথে যুক্ত হোন। যখন আপনি দেখবেন আপনার মতোই আরও অনেকে ভুল ইংরেজি বলছে এবং শিখছে, তখন আপনার ভয় অর্ধেক কমে যাবে।
কমিউনিকেশন বনাম গ্রামার: কোনটি জরুরি?
একজন বিদেশি যখন বাংলায় এসে বলে, “আমি আম খেতে চাইছি”, আমরা কি তার ব্যাকরণ নিয়ে হাসি? না, বরং আমরা খুশি হই যে সে আমাদের ভাষায় কথা বলছে। ইংরেজির ক্ষেত্রেও তাই। একজন নেটিভ স্পিকার (যাদের মাতৃভাষা ইংরেজি) কখনোই আপনার গ্রামার নিয়ে মাথা ঘামাবে না যদি সে আপনার কথা বুঝতে পারে। তাই গ্রামারের চেয়ে যোগাযোগ বা ‘Communication’-এর ওপর বেশি জোর দিন। আপনি যত বেশি কমিউনিকেট করবেন, গ্রামার তত প্রাকৃতিকভাবে আপনার আয়ত্তে চলে আসবে।
ভুলের খাতা তৈরি করুন
ভয়কে জয় করার একটি দারুণ উপায় হলো নিজের ভুলগুলোকে লিপিবদ্ধ করা। আপনি যখন কথা বলবেন বা লিখবেন, পরে খেয়াল করুন কোথায় ভুল হয়েছে। সেই ভুলগুলো লিখে রাখুন। এক সপ্তাহ পর দেখবেন, আপনি একই ভুল আর বারবার করছেন না। এটিই হলো প্রকৃত প্রগতি।
শেষ কথা: নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন
ইংরেজি শেখা কোনো রকেট সায়েন্স নয়। এটি অনেকটা সাঁতার শেখার মতো। যতক্ষণ আপনি জলে নামবেন না, ততক্ষণ আপনি হাত-পা নাড়া শিখবেন না। জল দেখে তীরে বসে থাকলে কোনোদিনও সাতারু হওয়া যায় না। ইংরেজিতে দক্ষ হতে চাইলে আপনাকে ‘ভুলের সাগরে’ ঝাঁপ দিতেই হবে।
আজ থেকেই প্রতিজ্ঞা করুন, আপনি ভুল করবেন, কিন্তু থেমে থাকবেন না। মনে রাখবেন, আপনার ভাঙা-চোরা ইংরেজিই একদিন ঝরঝরে ও সাবলীল ইংরেজিতে পরিণত হবে। আত্মবিশ্বাসই আপনার আসল সম্পদ। জয় হোক আপনার এই নতুন যাত্রার!